বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০২:২০ পূর্বাহ্ন

সমকামীদের অধিকার নিশ্চিত হোক

সানিমুল হাসিব জাকি
প্রকাশিত : বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০২:২০ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশে এলজিবিটিকিউ+ মানুষের জীবন বাইরে থেকে যতটা স্বাভাবিক মনে হয়, বাস্তবে তাদের অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই তার সম্পূর্ণ বিপরীত। যৌন অভিমুখিতা বা লিঙ্গপরিচয়ের কারণে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে তাদের বৈষম্য, ভয়, সামাজিক চাপ ও অস্বীকৃতির মুখোমুখি হতে হয়। এখানে জীবন এক ধরনের অদৃশ্য কারাগার। এবং এ কারাগারে সংখ্যালঘু কয়েদি হিসেবে এখানে জীবন অতিবাহিত করে।

এই বাস্তবতা কেবল একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং মর্যাদার স্তরে এক ধরনের প্রশ্নের উদ্রেক করে। একজন মানুষের যৌন অভিমুখিতা বা লিঙ্গপরিচয় তার মৌলিক অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করার কারণ হতে পারে না।

ধর্ম ইসলামের বিশ্বাস ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও বিষয়টি নিয়ে গভীর বিতর্ক রয়েছে। ইসলামী ঐতিহ্যের কিছু প্রভাবশালী ব্যাখ্যায় সমকামী যৌন সম্পর্ককে নিষিদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং ঐতিহাসিকভাবে কিছু আলেম এ ধরনের সম্পর্কের জন্য কঠোর শাস্তির মত দিয়েছেন। হাদিস ও ফিকহের বিভিন্ন ব্যাখ্যায় এ বিষয়ে মতপার্থক্যও রয়েছে। কিন্তু কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে এলজিবিটিকিউ+ মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণা, নিপীড়ন কিংবা সহিংসতা বৈধতা পেতে পারে না।

বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতেও এলজিবিটিকিউ+ মানুষের অধিকারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা “প্রকৃতির নিয়মের পরিপন্থী” যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এই ধরনের ঔপনিবেশিক আমলের আইন ব্যক্তিগত যৌন আচরণ ও সম্মতিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপের প্রশ্ন তৈরি করে।

একই সঙ্গে যৌন অভিমুখিতা আর যৌন অপরাধ—এই দুটি বিষয়কে স্পষ্টভাবে আলাদা করা জরুরি।

দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক সম্মতিপূর্ণ সম্পর্ক এবং কোনো শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্কের ওপর যৌন নির্যাতন এক বিষয় নয়। শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন তার যৌন অভিমুখিতা বা অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে কখনোই বৈধ বা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য কোনো স্থানে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের আওতায় বিচার হওয়া প্রয়োজন। সেখানে শুধুমাত্র শরিয়াহ আইন, সামাজিক দৃষ্টিকোণ ও ধর্মের দোহাই দিয়ে অপরাধীকে আড়াল করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।

বাংলাদেশে এলজিবিটিকিউ+ মানুষের বিরুদ্ধে সামাজিক বৈষম্য, হয়রানি ও সহিংসতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। ধর্ম ইসলামের ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে এ মানুষদের হত্যাযজ্ঞ করে তোলা হয়। সমকামীদের যৌনতাকে দেখা হয় নাজায়েজ কাজ হিসেবে। এবং এদের হত্যা করা ও এদের লূত জাতির সাথেও তুলনা করা হয়। যাদের হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারলে পাপ মোচনের মধ্য দিয়ে অসীম সাওয়াবের অংশীদার হওয়া যায়।

একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সম্মতি, মর্যাদা এবং স্বাধীনতার গুরুত্ব থাকা উচিত। তাই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা আইনগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যৌন সহিংসতা, শিশু নির্যাতন ও জবরদস্তির বিরুদ্ধে আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এমন একটি সমাজ হওয়া উচিত, যেখানে কারও ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তাকে নিপীড়ন করা হবে না, আবার কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে অন্য মানুষের মৌলিক অধিকারও কেড়ে নেওয়া হবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং যৌন ও লিঙ্গপরিচয়ের স্বাধীনতা—সবকিছুর সুরক্ষা একই মানবিক নীতির অংশ।

এলজিবিটিকিউ+ মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার অর্থ কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তার পক্ষে দাঁড়ানো। রাষ্ট্রের উচিত বৈষম্যমূলক আইন ও নীতির সংস্কার করা, সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং এমন একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন মানুষ নিজের পরিচয়ের কারণে ভয় বা লজ্জার মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য না হন।

বাংলাদেশ সরকারের উচিত শীঘ্রই সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, বাক্‌স্বাধীনতা দিতে হবে, ভালোবাসার অধিকারও দিতে হবে, মৌলবাদকে ছুড়ে ফেলতে হবে, ধর্মীয় উপদেশ বন্ধ করতে হবে।


আরও পড়ুন